রোগমুক্ত পশুপালনের পথে ভারত, NADCP-তে ১৪৭ কোটি টিকা- ক্ষুরা রোগের প্রাদুর্ভাব ৬৯ শতাংশ কমেছে, ব্রুসেলোসিসও নিয়ন্ত্রণে; ডিজিটাল নজরদারি ও One Health-এ জোর

অন্যান্য স্বাস্থ্য

 নিতাই মালাকার, (কোলকাতা) বাংলার চাণক্য নিউজ ডেস্ক:-  দেশের পশুসম্পদকে সংক্রামক রোগের হাত থেকে সুরক্ষিত করে কৃষকের জীবিকা ও পশুপালন ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করতে বড়সড় উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্র। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া জাতীয় প্রাণী রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (NADCP)-র আওতায় এখনও পর্যন্ত ১৪৭.১৬ কোটি ক্ষুরা রোগের (FMD) টিকার ডোজ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে উপকৃত হয়েছেন প্রায় ৮.০৪ কোটি কৃষক। ধারাবাহিক টিকাকরণ ও নজরদারির জেরে ক্ষুরা রোগের রিপোর্ট হওয়া প্রাদুর্ভাব ২০১৯ সালের ১৩২টি থেকে কমে ২০২৫ সালে ৪০টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ব্রুসেলোসিসের প্রাদুর্ভাবও ২২টি থেকে কমে ১৫টিতে নেমেছে।
ভারতের বিপুল পশুসম্পদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই কর্মসূচির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০তম পশুসম্পদ গণনা অনুযায়ী, দেশে মোট পশুসম্পদের সংখ্যা ৫৩৫.৭৮ মিলিয়ন। এর মধ্যে গবাদি পশু রয়েছে ৩০২.৭৯ মিলিয়ন। ক্ষুরা রোগের কারণে দুধ উৎপাদন কমা, পশুর বৃদ্ধি ও কর্মক্ষমতা ব্যাহত হওয়া এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বিধিনিষেধ তৈরি হয়। অন্যদিকে ব্রুসেলোসিস মূলত গরু ও মহিষের প্রজনন ক্ষমতা ও দুগ্ধ উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
NADCP-র লক্ষ্য বছরে দু’বার সমস্ত সংবেদনশীল পশুকে ক্ষুরা রোগের টিকা দেওয়া এবং ৪ থেকে ৮ মাস বয়সী স্ত্রী গবাদি পশুর বাছুরকে জীবনে একবার ব্রুসেলোসিসের টিকা দেওয়া। টিকাকরণের পাশাপাশি রোগের নমুনা পরীক্ষা, সেরো-নজরদারি, প্রাদুর্ভাবের তদন্ত, ভাইরাস শনাক্তকরণ, কোয়ারান্টাইন এবং পশু চলাচল নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। টিকা ও শীতল শৃঙ্খল ব্যবস্থার মান বজায় রাখার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সেরো-পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ক্ষুরা রোগের O, A এবং Asia1 সেরোটাইপের বিরুদ্ধে গড় সুরক্ষামূলক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যথাক্রমে ৭৮.১, ৭১.৭ এবং ৭৭.৬ শতাংশ। গত তিন বছরে দেশে Asia-1 সেরোটাইপের কারণে ক্ষুরা রোগের কোনও প্রাদুর্ভাবও ঘটেনি। ২০২৫ সালের পর্যবেক্ষণে ব্রুসেলোসিসের টিকা নেওয়ার পর গরুর বাছুরের সেরোকনভার্সনের হার ৭৫.৬৩ শতাংশ এবং মহিষের বাছুরের ক্ষেত্রে ৬৭.১৭ শতাংশ।
রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পশুস্বাস্থ্যের পরিকাঠামোও বাড়ানো হয়েছে। ২৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ৪,০১৯টি Mobile Veterinary Unit-এর মাধ্যমে ১৯৬২ টোল-ফ্রি নম্বরে বাড়ির দোরগোড়ায় পশুচিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত ১৩৬ লাখ কৃষক এই পরিষেবা পেয়েছেন এবং চিকিৎসা হয়েছে ২৭৬ লাখ পশুর।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাতেও জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত পশুধন পোর্টাল-এ ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৩৯ কোটিরও বেশি পশু নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিটি পশুকে ১২ সংখ্যার অনন্য Tag ID দেওয়া হচ্ছে। ফলে টিকাকরণ, পশুর পরিচয় এবং রোগের নজরদারি আরও দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক হচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ ও রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারের আর্থিক অঙ্গীকারও বেড়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে Livestock Health and Disease Control Programme-এর মোট বরাদ্দ ২,০১০ কোটি টাকা। ICAR-এর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে টিকা গবেষণা, রোগ নির্ণয়, সেরো-নজরদারি ও নমুনা সংগ্রহের কাজে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
পশুস্বাস্থ্যের সঙ্গে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশকে একসূত্রে দেখার জন্য One Health পদ্ধতিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জুনোটিক রোগের ঝুঁকি কমানো, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ মহামারীর প্রস্তুতি এই ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য।
২০২৪ সালে G20 Pandemic Fund-এর সহায়তায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের Animal Health Security Strengthening in India for Pandemic Preparedness and Response প্রকল্পও শুরু হয়েছে। ADB, FAO এবং বিশ্বব্যাংকের অংশীদারিত্বে এই প্রকল্পে রোগ নজরদারি, পরীক্ষাগার পরিকাঠামো, জিনগত ও পরিবেশগত নজরদারি এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, NADCP-র মাধ্যমে টিকাকরণ, রোগ নজরদারি, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আধুনিক পশুচিকিৎসা পরিষেবাকে একত্রিত করে রোগমুক্ত ও উৎপাদনশীল পশুপালন ক্ষেত্র গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে ভারত। পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার এই অগ্রগতি কৃষকের আয়, দুধ উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ মহামারী মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ADVT

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *