নিজের বিদায়ের পথ নিজেই তৈরি করেছিলেন মমতা

রাজনীতি রাজ্য

বিশেষ প্রতিবেদনটি লিখেছেন—- বিশিষ্ট সাংবাদিক,রাজনৈতিক বিশ্লেষক–নিতাই মালাকার

নিতাই মালাকার(বিশিষ্ট সাংবাদিক,লেখক) বাংলার চাণক্য নিউজ ডেস্কঃ-  ১৫ মার্চ নির্বাচন কমিশন ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার পর এক বর্ষীয়ান সাংবাদিক দাদা হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, এবারের ভোটের ফলাফল কী হবে। জবাবে তাঁকে জানিয়েছিলাম, বিজেপি সর্বোচ্চ ১৮০টি-র মতো আসনে জয়ী হতে পারে। আমার এই পূর্বাভাসে শুধুমাত্র ওই বর্ষীয়ান সাংবাদিক নন, অনেককেই চমকে দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারতে পারেন, তাঁরা তা বিশ্বাস করতে পারেননি।
আসলে যে ভাবমূর্তি এবং বিপুল জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে তিনি ৩৪ বছর ধরে বাংলার কুর্সিতে থাকা সিপিএম-কে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, তা এককথায় নজিরবিহীন। অনেক প্রত্যাশা, অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাংলার মানুষ মমতার হাতে শাসনভার তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্যের মানুষকে তিনি বারবার আশাহত করেছেন।
মনে পড়ছে, ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ দিলীপ দে সরকার তাঁর নিজের ঘরেই তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সমর্থকদের হাতে আক্রান্ত হন। এই ঘটনায় অধ্যক্ষ পদত্যাগ করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তখন মমতা বলেছিলেন, দুষ্টু ছেলেরা ভুল করে দুষ্টুমি করে ফেলেছে। শিক্ষক পেটানো ওই ছাত্রদের অবশ্য কোনও শাস্তি হয়নি। হওয়া
সম্ভবও নয়। এর পর রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে একের পর এক নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটিয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুর কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক কালেশ্বর বর্মন টিএমসিপি-র হামলায় গুরুতর আহত হন।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইসলামপুর কলেজে দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে অধ্যক্ষের অফিসের সামনে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায় এবং সেখানেও মারধরের অভিযোগ ওঠে। খোদ কোলকাতার বুকেও বিভিন্ন কলেজে ঘটেছে একের পর এক ঘৃণ্য ঘটনা।
শিক্ষাঙ্গনে যে দুর্বৃত্তায়নের বৃত্ত তৈরি হয়েছিল, তা কালক্রমে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর বাংলায়। একদিকে বাংলার গ্রামেগঞ্জে দেখা গেছে শাজাহান, জাহাঙ্গিরদের মতো দুর্বৃত্তদের অবাধ দৌরাত্ম্য, অন্যদিকে, পাড়ায় পাড়ায় কায়েম হয়েছে গুন্ডারাজ।
শিক্ষায় পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি। চাকরি দেওয়ার নামে প্রার্থীদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আদায়, সেইসঙ্গে বেআইনি নিয়োগ, ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সবই করেছেন তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা। সুপ্রিম কোর্টে ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল শিক্ষায় দুর্নীতিকে বেআব্রু করে দেয়।
চাকরি নেই, শিল্প নেই, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিনদিন বাড়ছিল। মানুষের ক্ষোভে ঘৃতাহুতি দেয় আর জি হাসপাতালে এক মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। লাখো লাখো মানুষের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলা। এই ঘটনায় মমতার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এতদিন ধরে জনমাসসে তাঁর যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল, এই ঘটনায় তাতে চিড় ধরতে শুরু করে। কীসের স্বার্থে দোষীদের আড়াল করতে তিনি তৎপর হয়ে উঠেছিলেন, সেই প্রশ্নও ওঠে।
এতকাল যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মমতাকে উজাড় করে ভোট দিয়ে এসেছেন, এবার তাঁরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মুসলিমদের ভোটের একটা অংশ গেছে বিজেপির দিকে। শুধু তাই-ই নয়, মহিলাদের ভোট-ব্যাঙ্কেও এবার ফাটল ধরেছে। মহিলাদের একটা বড় অংশ বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন।

তার ওপর ১৫ বছরের শাসনের সূত্রে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। বলতে গেলে, গত কয়েক বছর ধরে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ছিল। তৃণমূল নেত্রীর দিশাহীন অবস্থা ক্রমশ প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছিল। দলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। বাংলার মানুষ বুঝতে পারছিলেন, অভিষেক ব্যানার্জি দলের মধ্যে নিজের যে বৃত্ত তৈরি করেছেন, তাতে শাহজাহানের মতো দুষ্কৃতীরাই মধ্যমণি হয়ে উঠছেন। তাই বাংলার মানুষ মমতার ওপর আর আস্থা রাখতে পারছিলেন না, যার জবাব তাঁরা দিলেন এবারের ভোটযন্ত্রে।
বহু চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলায় তাঁর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন মমতা। পোড় খাওয়া নেত্রী হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাস থেকে তিনি কোনও শিক্ষা নেননি। নিজেকে সংশোধনের অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই পথে হাঁটার প্রয়োজনবোধ করেননি। তাই কিছু কিছু ভালো কাজ করা সত্ত্বেও কলঙ্কের বোঝা নিয়ে তাঁকে চলে যেতে হল। 

ADVT

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *