‘শৃঙ্খলিত মৃত্তিকা’র স্রষ্টা সাহিত্যিক শিশির দাশের প্রয়াণ, গভীর শোক ডায়মণ্ডহারবারে

অন্যান্য রাজ্য শিক্ষা

তোতন দাশ,বাংলার চাণক্য নিউজ ডেস্ক:- সত্তর দশকে বাংলার সেরা সাহিত্যিক শিশির দাশ শুক্রবার সকাল ৮ টা ৪৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রয়াণকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।তাঁর প্রয়াণে ডায়মণ্ডহারবার তথা সমগ্র সাহিত্যজগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।  পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তবুও তিনি লেখালেখি বন্ধ করেনি, সম্প্রতি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কোলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এদিন তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে অসংখ্য ভক্ত পাঠক পাঠিকা, ছাত্র-ছাত্রী,নাট্যপ্রেমিকরা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে  ডায়মন্ড হারবারের বাড়িতে হাজির হন। এদিন তাঁর প্রয়াণে গভীরভাবে শোক প্রকাশ করে ডায়মন্ড হারবারের প্রাক্তন বিধায়ক বিজিপি নেতা দীপক হালদার। তিনি তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিতে ডায়মন্ড হারবারের কালিনগর মহাশ্মশানে উপস্থিত হয়ে তাঁর পরিবারবর্গকে সমবেদনা জানান।  পাশাপাশি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন, সমাজসেবী রেজাউল করিম মল্লিক, লেখক সাংবাদিক ডাক্তার ইয়ারনবী গায়েন সহ বহু বিশিষ্ট মানুষজন।গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ডায়মন্ডহারবার পৌরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রনব দাস।

এদিন ডায়মন্ডহারবারের প্রাক্তন বিধায়ক বিজেপি নেতা দীপক হালদার বলেন, ‘তাঁর প্রয়াণে গভীর ভাবে মর্মহত করেছে। বাংলা ভাষা সাহিত্যক হিসাবে তাঁর অসাধারণ সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র যুগের সূচনা করেছিলেন।তাঁর সৃষ্টিশীলতা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং পাঠকের মনে স্থায়ী আসন গড়ে তুলে ছিলেন।তাঁর প্রয়াণে সমাজজীবনে অপূরনীয় শূন্যতা সৃষ্টি হলো’।

 জানা গেছে,শিশির দাশের স্ত্রী পূরবী দাশ গত তিন বছর আগে মারা যান। তিনি ও ডায়মন্ড হারবার বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। শিশির দাশের ২১শে ডিসেম্বর ১৯৩৮ সালে জন্ম হয় বর্ধমান জেলার কাটোয়াতে। কিন্তু সারা জীবন ডায়মন্ড হারবারে ( ডায়মন্ড হারবার হাই স্কুলে) শিক্ষকতা করছেন। বাঙলা সাহিত্যের প্রথম সারির একজন লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ঠিক সেই সময় প্রায়৪ বছর ধরে হিমালয় ভ্রমনে চলে যান। ফিরে এসে আবারও চাকরি তে যোগ দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন।  তেভাগা আন্দোলনের উপরে লেখা উপন্যাস  ‘শৃংখলিত মূততিকা’ র জন্য তিনি ‘আনন্দ পুরস্কার’ লাভ করেন। ধাত্রী পান্না, অনুগল্পের জন্য সারা বাংলাতে প্রথম পুরস্কার লাভ করেন। তখন প্রতি রবিবাসরীয়তে তাঁর গল্প, উপন্যাস ছাপা হতো। একটা সময় তিনি   ‘প্রিয় তম নবী’ লেখার পর আর তিনি সাহিত্য রচনা করতে রাজি হননি।
মূতুর সময় তাঁর দুই মেয়ে সেঁজুতি ও গোধূলি কে রেখে বিদায় নিলেন।


এদিন ড: শিশির দাশ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লেখক সাংবাদিক ডাক্তার ইয়াননবী গায়েন বলেন, সত্তর দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সাহিত্য কবিতায় যে সমস্ত লেখক কবিরা বাজার মাৎ করতেন, তাদের একজন দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ডায়মন্ড হারবারের বাসিন্দা সাহিত্যিক শিশির দাশ।। সমসাময়িক এই জেলার একমাত্র স্বনামধন্য কবি শামসুল হক। শিশির দাসের জন্ম ২১শে ডিসেম্বর ১৯৩৮। স্থান বর্ধমান জেলার বারুইগ্রামে। কবি কালিদাস রায়ের পাশের বাড়ি। মূলত মামা বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা শুরু ।পিতৃভিটা মৌগ্রাম। কোলকাতা থেকে বাংলায় অনার্স সহ প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক হয়ে ডায়মন্ড হারবারের উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ কয়েক বছর শিক্ষকতা করেন। মাঝে তিন বছর চাকরি ছেড়ে লেখক হবার সাধনা নিয়ে বাউন্ডুলের মত পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন। বাম বগলে বামদেবের চক্রবর্তীর ব্যাকরণ বই গুঁজে  পথে হাঁটতে। তখন বিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিশির বাবুকে দেখতে পেলেই বলে উঠতো ‘বগলে বামদেব আসছেন’ ।
অতি সৌভাগ্যবশত আমি তাঁর ছাত্র। তাঁর কাছে সাহিত্য চর্চা শুরু করি ।তিনি নবম শ্রেণীতে কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি এত গুরুগম্ভীর আর মধুর করে পড়াতেন বলে, আমার মত কঠোর নিষ্ঠুর ছাত্রের কলম থেকে আমার প্রথম কবিতাটি ‘পাগল কবি’ বেরিয়েছিল ।
পশ্চিমবাংলা জুড়ে যখন প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমলা মিত্র, বিমল করের মত লেখকরা লিখছেন তখন। প্রায় প্রতি রবিবার আনন্দবাজারের পাতায় শিশির দাশের  ছোট গল্প ছাপা হতো। যেমন ‘রাজ রোগ’, ‘ধাত্রী পান্না’ গল্পগুলি অনেকের সঙ্গে আমিও পড়ার সাক্ষী।
১৯৬১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তাঁর প্রথম সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘আগুনের শাখা-প্রশাখা’।

 বাম জমানায় রাজত্বের প্রাক্কালে প্রকাশিত হয় কাকদ্বীপের চন্দন পিড়ির  আন্দোলনের কাহিনী নিয়ে ‘শৃঙ্খলিত  মৃত্তিকা’।পাশাপাশি ইয়ারনবী গায়েন আরও জানান, শিশির দাশ কখনো লেখা থেকে কোন পারিশ্রমিক কোন প্রকাশকের কাছ থেকে নিতেন না চাকরি ছেড়ে তিনি প্রায় তিন বছর পথে পথে ঘুরে লেখার রসদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সময় তিনি চরম দারিদ্রতার কবলে পড়েছিলেন। ডায়মন্ডহারবার পৌরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর টালির মাটির বাড়িতে প্রথম জীবন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে গেলেন। বহু পড়াশোনা করে লিখলেন ‘প্রিয়তম নবী’, বাজারে যে বই বারবার সংস্করণ হয়ে জলের মতো বিক্রি হয়েছিল। তার সমস্ত পারিশ্রমিক ‘জগন্নিবাস’ সংস্কারে দিয়ে দিতেন। ১৯৮০ সালে কঠোর পরিশ্রম করে ডায়মন্ড হারবার রবীন্দ্রভবন একক প্রচেষ্টায় স্থাপন করেন। পরেই তৎকালীন ডায়মন্ড হারবারের মহকুমা শাসক সৌরভ দাশ তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। পরে সরকারি সাহায্যে আজ ডায়মন্ড হারবার রবীন্দ্রভবন সুসজ্জিত রূপ পায়।  কিন্তু অভিমানী শিশির দাশ আর রবীন্দ্রভবনে আর কোনদিনও যাননি। তাঁর গল্প কবিতা তথা সমস্ত সাহিত্যের ভাষা প্রয়োগ সঁহজ- সরল। প্রমথ চৌধুরীর পর বাংলা সাহিত্যে এমন প্রাঞ্জল ভাষা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। ৮৭ বছরে আজ শেষ নিঃশ্বাস তাগের আগে পর্যন্ত নিজের টালির বাড়ির লাইব্রেরীতে পড়াশোনা নিয়ে দিনরাত কেটেছে। পন্ডিত অথচ নিরহংকারী নিপাট ভদ্রলোক সাহিত্য সাধক শিশির দাশ আজ চির বিদায় নিলেন। রেগে গেলেন তাঁর লেখা অসংখ্য গল্প উপন্যাস’।কিছুটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আক্ষেপের সুরে ইয়ারনবী বাবু বলেন,’ বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তাঁকে চেনেন না’।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *