হারিয়ে যেতে বসা মা, ঠাকুরমা, দিদিমা, ঘরোয়া জ্ঞান, সংরক্ষণ জরুরি

অন্যান্য স্বাস্থ্য

সংগৃহীত ছবি–

 নিতাই মালাকার. (কোলকাতা)বাংলার চাণক্য নিউজ ডেস্ক:-    আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা  ঠাকুমা-দিদিমার ঘরোয়া টোটকা ও অভিজ্ঞতা। অথচ এই জ্ঞান শুধু অসুস্থতার সময়ে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়ার উপায় ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবার, প্রকৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্ক।
ধরা যাক, একটি ছোট শিশু পেটের ব্যথায় কাতরাচ্ছে। মা তখন চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই সময় দাদি এক গ্লাস গরম জল এনে তাতে এক চামচ জোয়ান বা অজওয়াইন দিয়ে খেতে দিচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি ফের খেলায় মেতে উঠছে। এমন দৃশ্য একসময় বহু ভারতীয় পরিবারের পরিচিত ছবি ছিল। প্রশ্ন হল, এই অভিজ্ঞতা কি আগামী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছবে?
আজকের প্রজন্ম বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এতে আপত্তির কারণ নেই। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া জ্ঞানকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়। এই জ্ঞান গড়ে উঠেছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তা ছড়িয়ে পড়েছিল।
একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়ির রান্নাঘরই যেন ছিল ছোটখাটো ‘মিনি মেডিক্যাল স্টোর’। জোয়ান, হিং, মৌরি, হলুদ, দারচিনি, তুলসী, লবঙ্গ, মধু, ঘি—রান্নার স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি এগুলির নানা ঐতিহ্যবাহী ব্যবহারও ছিল। গলা খুসখুস করলে গরম জলে নুন, কফ হলে আদা-মধুর মিশ্রণ কিংবা ঘুম না এলে গরম দুধের সঙ্গে সামান্য জায়ফল—এ ধরনের বহু ঘরোয়া পদ্ধতি মানুষের জীবনযাত্রার অংশ ছিল।
শুধু ঘরোয়া চিকিৎসাই নয়, জীবনযাপন নিয়েও নানা নিয়ম মানতেন প্রবীণরা। রাতে দই না খাওয়া কিংবা সকালে খালি পেটে লেবু জল খাওয়ার মতো অভ্যাসের পিছনেও অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা কাজ করত।
কিন্তু আধুনিক জীবনের দ্রুত গতিতে সেই ধৈর্য অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। বাজারে সহজলভ্য তাৎক্ষণিক আরামের ওষুধ, ট্যাবলেট ও সিরাপের উপর নির্ভরতা বেড়েছে। অন্যদিকে, পরিবারের প্রবীণদের সংখ্যা থাকলেও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যথেষ্ট পৌঁছচ্ছে না। শিশুদের সঙ্গে প্রবীণদের কথোপকথন কমছে। অনেক প্রবীণও নিজেদের অভিজ্ঞতা বা পরামর্শ দিতে দ্বিধা করছেন, কারণ নতুন প্রজন্ম অনেক সময় গুগলকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করে।
ঠাকুরমা, দিদিমা এই টোটকাগুলি কেবল চিকিৎসা-পদ্ধতি ছিল না; এগুলি ছিল পরিবারের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে এবং নিজের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম। অসুস্থ শিশুর কপালে হাত রেখে ঠাকুরমা  বলা, “কিছু হয়নি, একটু বিশ্রাম নাও”—এই স্নেহের স্পর্শও অনেক সময় মানসিক স্বস্তি দিত। সেই আবেগনির্ভর যত্নও আজ ক্রমশ বিরল হয়ে যাচ্ছে।
তাই প্রয়োজন এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে নথিবদ্ধ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মা, দিদিমা এর. টোটকা নিয়ে একটি খাতা তৈরি করা, শিশুদের সঙ্গে বসে মশলা ও ভেষজের ব্যবহার সম্পর্কে গল্প বলা—এমন ছোট উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুলে ‘ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যজ্ঞান’-এর মতো ঐচ্ছিক শিক্ষা চালুর কথাও ভাবা যেতে পারে। এতে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের মধ্যে ভারসাম্য সম্পর্কে শিশুদের ধারণা তৈরি হবে।
ঠাকুরমা, দিদিমা, এর ঘরোয়া জ্ঞান শুধুমাত্র কিছু টোটকার সমষ্টি নয়; এটি অভিজ্ঞতা, মমতা, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক মূল্যবান ঐতিহ্য। এই সম্পদ হারিয়ে গেলে শুধু জ্ঞানের ক্ষতি হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও। তাই এই হারিয়ে যেতে বসা সম্পদকে সংরক্ষণ, নথিবদ্ধ ও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া জরুরি। 

ADVT

ADVT

ADVT

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *