
নিতাই মালাকার,বাংলার চাণক্য নিউজ ডেস্ক :- হারের পর মাত্র ২ মাসও কাটেনি, গোটা তৃণমূল কংগ্রেস দলটাই প্রায় মমতা ব্যানার্জির হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই হাতছাড়া হয়েছে বেশ কিছু পুরসভা, জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত। এক সময়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোদ্ধারা একে একে প্রায় সবাই নেত্রীর সঙ্গ ছেড়েছেন। মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক, মেয়র, চেয়ারপার্সন, যাঁরা একসময় তাঁকে ঘিরে থাকতেন, তাঁরা এখন প্রায় কেউই নেই।
ববি হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কাকলি ঘোষদস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গীরা এখন সবাই বিদ্রোহী শিবিরে। সিপিএম থেকে বিতাড়িত হয়ে তৃণমূলে আসা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এখন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা।
এখন কে আসল তৃণমূল, আর দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে দুই শিবিরে দড়ি টানাটানি চলছে।
দুই পক্ষই এখন নির্বাচন কমিশনের শরণাপন্ন। বলতে গেলে মমতা আজ রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ। তবে কি তাঁর ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাস’ হয়ে গেল? তিনি কি আর কখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন?
কেউ কেউ মমতার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে
ইন্দিরা গান্ধীর দুঃসময়েরও তুলনা টানছেন। ১৯৬৯-এ ইন্দিরাকে দলের নেতারা বহিষ্কার করেছিলেন। ১৯৭৭-এর নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর নতুন দলেও বিদ্রোহের মুখে পড়েছিলেন জহরলাল নেহরুর কন্যা। কিন্তু দু’দু’বারই স্বমহিমায় ফিরে এসেছিলেন ইন্দিরা।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইন্দিরার মত মমতা কি পারবেন? এক কথায় উত্তর হল, কখনই নয়।
মমতা আর ইন্দিরার মধ্যে অনেক তফাত রয়েছে। ইন্দিরার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছিল, তা ছিল রাজনৈতিক। ইন্দিরা ছিলেন স্বৈরাচারী। আর মমতার জমানায় পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমাণ দুর্নীতি আর অনাচার হয়েছে, তা কখনও ঘটেনি। দলের নেতাদের ঘর থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার, চাকরি দুর্নীতি, দলের নেতাদের তোলাবাজি, গুন্ডামি, পাড়ায় পাড়ায় শাহজাহান, জাহাঙ্গিরের মত নেতাদের অত্যাচার, বলতে গেলে মমতার মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে চরম অরাজকতার শিকার হয়েছেন বাংলার মানুষ। তাঁরই প্রশ্রয়ে বাংলা হয়ে উঠেছিল দুর্বৃত্তদের মুক্তাঞ্চল। মুখ্যমন্ত্রী হয়েও এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কখনও তাঁকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। দিনের পর দিন তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনীর হাতে চরম নির্যাতিত হয়েছেন বাংলার মানুষ। মমতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনও অভিযোগ এখনও পর্যন্ত সামনে না এলেও, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ‘অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি হল কী করে, যে অভিযোগ বরাবরই তুলে এসেছে সিপিএম।
মৃতদেহ সৎকারের জন্য ‘সমব্যথী’ প্রকল্পে সরকারের দেওয়া ২০০০ টাকা শুরু করে প্রায় সমস্ত কল্যাণমূলক সরকারি প্রকল্পে দলের নেতারা কাটমানি আদায় করতেন। দুর্নীতির টাকায় দলের নেতারা প্রাসাদের মত বাড়ি বানিয়েছেন। সব দেখেও মমতা ছিলেন নীরব দর্শক।
যে মমতাকে এতকাল বিশ্বাস করে এসেছেন, আর জি কাণ্ড সেই বিশ্বাসযোগ্যতায় বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। আর জি কর হাসপাতালে যাবতীয় দুষ্কর্মের যিনি মূল পাণ্ডা, সেই সন্দীপ ঘোষ সকালে চাপের মুখে ইস্তফা দিলেও, বিকালেই তাঁকে ন্যাশনাল মেডিক্যালের অধ্যক্ষ পদে বদলি করা হয়। মানুষ বুঝতে পারলেন, মমতা কাউকে বাঁচাতে চাইছেন।
জরুরি অবস্থার পর ইন্দিরা প্রকাশ্যেই তাঁর ভুলের কথা স্বীকার করেছিলেন। জরুরি অবস্থার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে কথা বলেও, সে সময়ের সমস্ত ভুল ও বাড়াবাড়ির দায় পুরো নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্ত উদ্ধত, অহংকারী মমতাকে কখনও ভুল স্বীকার করতে দেখেননি রাজ্যের মানুষ। অনেকেই বলছেন, মমতা নন, সব কিছুর জন্য দায়ী অভিষেক। কে অভিষেক? বাংলার মানুষ তো অভিষেককে দেখে ভোট দেননি। সিপিএমের অপশাসনের বিরুদ্ধে তাঁরা মমতার ওপর বিশ্বাস রেখে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্ত বাংলার মানুষের সেই বিশ্বাসকে পদদলিত করেছেন তৃণমূল নেত্রী।
সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই মমতার উত্থান। নিজের হাতে গড়া দলকে ধ্বংস করেছেন। মমতার মুখ ছাড়া তৃণমূলের একজন জনপ্রতিনিধিদেরও জেতার ক্ষমতা নেই। অথচ নেতাদের দুর্নীতি, অপকর্ম দেখে তিনি চুপ ছিলেন কেন? এলাকায় এলাকায় দুর্বৃত্তরা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুললেও, পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। অর্থাৎ রাজধর্ম পালনে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ। এর পরিণতি হিসেবে বাংলার মানুষ এখন দেখছেন, তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ।
মমতার আজকের এই দুর্দিনের দায় তাঁর নিজেরই। তিনি কখনও কোনও ন্যায়নীতির ধার ধারেননি। ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা ছলছাতুরির আশ্রয় নিলেও, এবার তা কাজে আসেনি। তাঁর ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন মানুষ, একসময় তাঁকে অন্ধের ভরসা করতেন। ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ ছাড়া রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কখনই ভাবেননি। শিক্ষা, চাকরি, শিল্প, সব কিছুই ধ্বংস করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস বলছে, একবার যাকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করে, তাকে ফিরিয়ে আনে না। ১৯৭৭-এ কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট। ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১তে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। আর ২০২৬-এ বাংলার বাংলার শাসন ক্ষমতার দখল নিয়েছে বিজেপি। বড় কিছু না ঘটলে, আগামী ১০ বছর অন্তত বিজেপির ক্ষমতায় থাকা একরকম নিশ্চিত। ১৯৭৭-এ ইন্দিরার পতনের পর কেন্দ্রে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার সূত্র ধরে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই দিল্লির কুর্সিতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। পশ্চিমবঙ্গে সে ধরনের পরিস্থিতির সম্ভাবনা একবারে নেই বললেই চলে। তাঁর ওপর মমতার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন একেবারে তলানিতে, যা ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।






