জীবনদায়ী ‘কল্পবৃক্ষ’ নারকেল, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের দাপট

রাজ্য

 নিতাই মালাকার, (কোলকাতা)বাংলার চাণক্য নিউজ ডেস্ক:-    গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষিজীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত নারকেল এখন ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। প্রায় ৩ কোটি মানুষ, যার মধ্যে প্রায় ১ কোটি কৃষক, নারকেল ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশীল। উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম সারিতে থাকা ভারত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে নারকেলজাত পণ্য রফতানি করেছে ৭,০৩৮.৩৫ কোটি টাকার, যা আগের বছরের ৪,৩৪৯.০৩ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৬২ শতাংশ বেশি।
‘কল্পবৃক্ষ’ হিসেবে পরিচিত নারকেল গাছ থেকে খাদ্য, পানীয়, তেল, তন্তু, কাঠ, জ্বালানি থেকে শুরু করে নানা মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি হয়। ফলে নারকেল চাষ শুধু কৃষকদের জীবিকা নয়, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র শিল্পেরও বড় ভিত্তি। ভার্জিন নারকেল তেল, নারকেলের দুধ, নারকেলের জল এবং অ্যাক্টিভেটেড কার্বনের মতো পণ্যের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়েছে।
কৃষি ও কৃষক কল্যাণ দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে দেশে প্রায় ২১.৯ লক্ষ হেক্টর জমিতে ২০,৩০১.২২ মিলিয়ন নারকেল উৎপাদিত হয়েছে। চাষের জমির পরিমাণে কেরল এগিয়ে থাকলেও উৎপাদনে তামিলনাড়ু এবং উৎপাদনশীলতায় অন্ধ্রপ্রদেশ শীর্ষে। পশ্চিমবঙ্গও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।
নারকেল ক্ষেত্রের সম্প্রসারণে ছত্তিশগড়ের বস্তার একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। কোণ্ডাগাঁওয়ের ডেমোনস্ট্রেশন কাম সিড প্রোডাকশন ফার্মের উদ্যোগে কৃষকদের নারকেল চাষের পাশাপাশি আন্তঃফসল চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাঁকাওয়ান্ডের কৃষক ২,৫০০টি নারকেল গাছের বাগানে আনারস, ড্রাগন ফল, আম, লেবুজাতীয় ফল, কলা, পেয়ারা, পেঁপে, কফি ও মরশুমি সবজি চাষ হচ্ছে। নারকেল থেকে বছরে ৫-৬ লক্ষ টাকা এবং আন্তঃফসল থেকে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নারকেল উন্নয়ন পর্ষদের মাধ্যমে সরকার উন্নত মানের চারা উৎপাদন, নতুন এলাকায় চাষ সম্প্রসারণ, পুরনো বাগানের পুনরুজ্জীবন, রোগ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্য সংযোজনের উপর জোর দিচ্ছে। ২০২৫-২৬ সালে প্রায় ২,১৭৫ হেক্টর জমি নতুন করে নারকেল চাষের আওতায় এসেছে এবং ১,৬৭২ হেক্টর জমিতে পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একই বছরে ১১টি ডিএসপি ফার্মে ২.৪১ লক্ষ উন্নত মানের চারা উৎপাদিত হয়েছে।
কৃষকদের স্বার্থে  ন্যূনতম সহায়ক মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬ মরশুমে মিলিং কোপ্রার এমএসপি কুইন্টালপ্রতি ১২,০২৭ টাকা এবং বল কোপ্রার ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদকরা আরও লাভজনক দাম পাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত হবেন।
রফতানি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে নারকেল উন্নয়ন পর্ষদ। ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬-এর মধ্যে নারকেলভিত্তিক পণ্যের রফতানি ৩,২৩৬.৮৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭,০৩৮.৩৫ কোটি টাকা হয়েছে। আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, জার্মানি, রাশিয়া, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস-সহ একাধিক দেশে ভারতীয় নারকেলজাত পণ্যের বাজার বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ ঘোষিত নারকেল উন্নয়ন প্রকল্প এই ক্ষেত্রকে আরও গতি দিতে চলেছে। উন্নত চারা উৎপাদন, পুরনো বাগানের পুনরায় রোপণ, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং মূল্য সংযোজিত পণ্যের জন্য সমন্বিত প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘ফ্রেন্ডস অফ কোকোনাট ট্রি’, ‘কোকোমিত্র’, নারকেল হস্তশিল্প ও নীরা সংগ্রহের মতো প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ কর্মী ও নতুন উদ্যোগ তৈরির চেষ্টা চলছে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *